- দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত
- নতুন করে উত্তরাঞ্চলে বন্যার পূর্বাভাস
- চট্টগ্রামে এইচ এসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত
- ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখবে সরকার
আবারো দেশে ভয়াবহ বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দেশের সাত জেলায় আগামী সপ্তাহে বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ১৯ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় অর্ধশত প্রাণহানির পাশাপাশি শতাধিক হতাহত হয়েছে। বন্যা ও জলবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ১৭ হাজারে পৌঁছেছে। ৫০ হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দী জীবন যাপন করছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে।
বন্যাকবলিত সাত জেলা হলো খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার ৫৭টি উপজেলা এবং আটটি পৌরসভা বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন জানান, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে সাতজন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। আহত ৪০ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ২৫ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুজন এবং খাগড়াছড়িতে একজন রয়েছেন। কক্সবাজারে এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন বা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ১৫ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বান্দরবানের সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে সাতজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। রাঙামাটির নয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ির ১০টি উপজেলার ৪১টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে কোনো প্রাণহানির তথ্য নেই, আহত হয়েছেন একজন। মৌলভীবাজারের সদর ও রাজনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন আক্রান্ত হয়েছে, সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। হবিগঞ্জের সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নও বন্যাকবলিত হয়েছে।
এদিকে গত কয়েক দিনে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও নতুন করে আবারও উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল শুক্রবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে দেশের সাত জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, ১৯ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহানের সই করা বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি কিছুটা কমেছে। তবে আগামী তিন দিনে উজানের বৃষ্টিপাতের প্রভাবে এসব নদীর পানি আবার বাড়তে পারে। কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও সুরমা নদীর পানি কমেছে। আগামী তিন দিনে দুই নদীরই পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানিও বেড়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আগামী পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়ার কয়েকটি পয়েন্টে সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ফেনী, মুহুরি, গোমতী ও সেলোনিয়া নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় কমেছে। আগামী এক দিনে এসব নদীর পানি কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী দুই দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে অবস্থান করা সুস্পষ্ট লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে উত্তর উড়িষ্যা এবং তৎসংলগ্ন বিহার ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় লঘুচাপ আকারে অবস্থান করছে।
চট্টগ্রামে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সব জেলায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই চলবে। এক বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ছিল। এ বিভাগের ৫ জেলায় আলিম এবং এইচএসসি ভোকেশনাল, বিএমটি, ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও স্থগিত থাকে। এর মধ্যেই রাতে ফের এসব পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা এল।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সাম্প্রতিক বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সার্বিক অবস্থা, পরীক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাটের কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া অসুবিধার বিষয়টিসহ সার্বিক বিবেচনায় চট্টগ্রাম বোর্ড ও এ বিভাগের ৫ জেলার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অবশিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
সহায়তা অব্যাহত রাখবে সরকার
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকার এখন আপাতত ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে দ্রুতই পুনর্বাসন কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।