দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর নিরাপদ মহানগরে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অপরাধ সংঘটনের পর নয়, অপরাধের আগাম প্রস্তুতি ও সন্দেহজনক গতিবিধিও শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) ও নারায়ণগঞ্জকে দেশের প্রথম পাইলট সেফ সিটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে পরবর্তীতে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য মহানগরে একই প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত 'Development of Safe City in Dhaka' প্রকল্পের টেকনিক্যাল সাব-কমিটির ৫ম সভায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিআইজি (ডেভেলপমেন্ট) মোঃ মুশফেকুর রহমান। সেখানে জানানো হয়, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও জিওলোকেশন জরিপের ভিত্তিতে কম ব্যয়ে এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এলাকাকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চূড়ান্ত করা হবে।

জিএমপি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (IIFC) এবং স্থানীয় পুলিশের যৌথ উদ্যোগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও ক্যামেরা স্থাপনের স্থান নির্ধারণের জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমোদন শেষে প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (ANPR), এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স, স্মার্ট অ্যালার্ম সিস্টেম, কেন্দ্রীয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও দ্রুত পুলিশি সাড়া নিশ্চিত করার প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। সন্দেহজনক ব্যক্তি, যানবাহন কিংবা অস্বাভাবিক চলাচল শনাক্ত হলেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সভায় আরও জানানো হয়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Hikvision, Huawei, Dahua, NEC, Motorola ও Uniview তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উপস্থাপন করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে Proof of Concept (POC) প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কারিগরি কমিটি এসব প্রযুক্তি মূল্যায়ন করে তুলনামূলক প্রতিবেদন দাখিল করবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রকল্পের সিস্টেম আর্কিটেকচার, সরঞ্জামের তালিকা, কারিগরি মানদণ্ড ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করার কাজ করছে।

জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য গাজীপুরের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শতভাগ নিরাপদ নগরী গড়ে তোলা। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।'

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার বলেন, 'সেফ সিটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আধুনিক এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুধু সংঘটিত অপরাধ নয়, অপরাধের আগাম প্রস্তুতি, সন্দেহজনক চলাচল এবং অপরাধীদের গতিবিধিও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এটি বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব আধুনিকায়ন প্রকল্প এবং সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে।'

গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, 'গাজীপুরে সেফ সিটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা সেবার সুফল ভোগ করবেন।'

নগর পরিকল্পনাবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর শুধু দেশের প্রথম এআইনির্ভর স্মার্ট নিরাপত্তা শিল্পনগরী হিসেবেই পরিচিত হবে না, বরং আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সারা দেশের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।