সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্তি সামনে রেখে আগামী মাসে নতুন কোন চমকের অপেক্ষা করছে সাধারণ মানুষ। বর্তমানে মন্ত্রী সভায় যারা আছেন তাদের বিগত দিনের আমলনামার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার কেবিনেট সদস্যদের কর্মকান্ডে পুরোদমে নজর রাখছেন। সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হচ্ছে আগামী আগস্ট মাসে। সে হিসেবে মন্ত্রিসভায় রদবদল, কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর আলোচনা চলছে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতার ছয় মাসের মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন মনে করলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের দপ্তর পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তবে এমন সিদ্ধান্ত সরকারের ১৮০ দিন পূর্তির পরই হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও তিনি জানান। মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি এ কথা বলেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করেছেন। একটি উপদেষ্টা পরিষদ তৈরি করেছেন। যেটুকু ওনার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আমি বুঝি, ওনার (প্রধানমন্ত্রী) যদি কখনো মনে হয়, কেউ ভালো পারফর্ম করতে পারছেন না, তার জায়গায় দপ্তর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দেওয়া, সেটা তিনি করবেন।’

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জনগণের কল্যাণ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো চয়েস বা সিদ্ধান্ত আরও বেটার করার সুযোগ যদি থাকে, তিনি সেটা করবেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে এটা মনে হয়েছে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, কোনো মন্ত্রী বা এমপি যদি দুর্নীতি কিংবা অনিয়মে জড়িত থাকেন, তবে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না এবং আইনের আওতায় আনা হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৪৮। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও রয়েছেন ২৩ জন মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। জাতীয় নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। তখন তার মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৪৯ জন সদস্য ছিলেন। পরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান গত ১ জুন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলে সদস্য সংখ্যা কমে ৪৮-এ নেমে আসে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগস্টে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর মন্ত্রীদের কর্মসম্পাদন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক সূত্রের দাবি, অন্তত দুই মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানো, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং যেসব মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে, সেখানে পরিবর্তন আনার বিষয়ও বিবেচনায় আছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় কয়েকজন মন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য; এই তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একইভাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন; এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন শেখ রবিউল আলম। এছাড়া শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদ, ডাক-টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় একই মন্ত্রীর অধীনে রয়েছে।

সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এসব ক্ষেত্রে কাজের চাপ কমাতে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন র্শীষ নেতা বলেন, সরকার গঠনের সময়ই জানানো হয়েছিল, প্রথম ছয় মাস মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

একাধিক সূত্রে জানা গেছে. কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। সে কারণেই দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়টি বিবেচনায় এসেছে। মন্ত্রিসভার আকারও সামান্য বাড়ানো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার ও বিএনপির একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য নতুন মুখের তালিকায় রয়েছেন এবিএম মোশাররফ হোসেন, সেলিমা রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বরকত উল্লাহ বুলু এবং জয়নুল আবদিন ফারুক। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন, কে বাদ পড়বেন বা নতুন করে কারা যুক্ত হবেন এ বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, এটি কোনো বিচিত্র ব্যাপার নয়, বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসাটাই নিয়ম। তবে তার মানে এই নয় যে, এটি এখনই হবে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সময়েই হতে হবে। এগুলো নিয়ে কথা বলার একমাত্র এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, তখনই কাউকে নতুন দায়িত্ব দিতে পারেন কিংবা কারও দায়িত্ব পরিবর্তন করতে পারেন।

চলমান আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুর্যোগকালীন পরীক্ষা গ্রহণসহ কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিব্রত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের আভাস রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সেমিনার ও সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ‘অতিকথনে’ প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো ক্ষুব্ধ।

নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের লোকজন লাইসেন্স বাঁচাতে কোটি টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছে। পরে ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি মন্ত্রীর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বক্তব্যের প্রমাণ তুলে ধরার দাবি জানান। এ ছাড়া কয়েক দিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালে তাকে মূল বিষয়ের বাইরে কথা বলতে নিষেধ করেন প্রধানমন্ত্রী।

ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা টেকনোক্রাট প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কর্মকান্ডে নিয়ে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগী লোকজন। তাদের অনেকে নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেছেন, ক্রীড়া দল গঠনের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সংস্থা ও ফেডারেশনে যাদের বসিয়েছেন তাদের অনেকে ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিগত দিনে আওয়ামীলীগের অপকর্মের বিরুদ্ধে ক্রীড়াঙ্গনে যারা সোচ্চার ছিলেন তাদের সংগঠনের বাইরে রাখা হয়েছে।

তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এক মন্ত্রী এবং দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকান্ডের কারণে তাদের দপ্তর কমানোর আলোচনা চলছে। গুঞ্জন রয়েছে, তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ওই মন্ত্রীর একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব্ কমানো হতে পারে। তিন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমার পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরও বদলাতে পারে।

বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘পরিবর্তন হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। যদি পরিবর্তন হয়, তবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাকে মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত করা যায়, তা তিনিই ভালো বোঝেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন তারেক রহমান। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেনÍঅভিযোগ পেলে যে যত বড় পদেই থাকুন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বেলায়ও এ পদক্ষেপ আরও জোরালো হবে। তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে চায় সরকার। সর্বশেষ গত ১০ মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে দলের এক কর্মসূচিতে সেই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হচ্ছে। আসলে কোন প্রক্রিয়ায় মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, তা নিয়ে একেকজন একেকভাবে বিশ্লেষণ করছেন।

কোন প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে সরকার?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করছেন সরকারপ্রধান। এক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীর-এমপির ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর হাতে জমা হয়েছে। দলের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু দুর্নীতিই নয় বরং যেকোনও পেশিশক্তি বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও কঠোর। তাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপে দেশে সুশাসন এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।