কক্সবাজার রুটে ট্রেন বন্ধ, তিন পার্বত্য জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

চট্টগ্রাম ব্যুরো: মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা পঞ্চম দিনের মতো অতি ভারী বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চার জেলায় হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়ায় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২২৩ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতকে অতি ভারী বর্ষণ হিসেবে ধরা হয়। ফলে টানা চার দিনের মতো এবারও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সকালে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিকেল থেকে আবারও মুষলধারে বর্ষণ শুরু হয়।

নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, মুরাদপুর, শুলকবহর, অলংকার, পতেঙ্গা, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ে।

টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ধসে অন্তত ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামা উপজেলার মিশনপাড়ায় পাহাড়ধসে দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। এর আগে বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে পাহাড়ধসে এক কিশোরী ও এক শিশুর মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম নগরের সুন্নিয়া মাদরাসা এলাকা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেললাইন পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানি নেমে যাওয়ার পর লাইন পরীক্ষা করে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী আরও অন্তত দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা ও নিচু অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে টানা বর্ষণে বান্দরবানের সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বহু বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কসহ হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা করুণা বড়ুয়া জানান, পৌর এলাকায় ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় চার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের জন্য প্রতিদিন দুই বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও মশার কয়েল বিতরণ করা হচ্ছে। পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক জানান, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।

কক্সবাজারেও টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় মোট ৬৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রোববারই ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, আকাশে এখনও ঘন মেঘ রয়েছে এবং আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

রাঙামাটিতেও টানা চারদিনের ভারী বর্ষণে বন্যা ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালা-সাজেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে প্রায় ৪০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতির কারণে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাঙামাটির এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নিতে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা কাজ করছেন।

খাগড়াছড়িতেও টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন নি¤œাঞ্চলের বসতবাড়ি প্লাবিত হয়েছে এবং অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এর মধ্যে শুধু দীঘিনালা উপজেলার ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ দৈনিক বৃষ্টিপাত। টানা এই অতি ভারী বর্ষণে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্যোগ পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চকরিয়ায় পাহাড় ধসে ভাইবোনসহ ৮জনের মৃত্যু

শাহজালাল শাহেদ, চকরিয়া: টানা চারদিনের ভারী বর্ষণে চকরিয়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। পৃথক পাহাড় ধসে ও পানিতে ভেসে গিয়ে মারা গেছে ভাই-বোনসহ ৮জন। বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এবছর প্লাবিত হয়েছে নি¤œাঞ্চলের নতুন নতুন গ্রাম।

আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সরেজমিন জানা গেছে, গত সোমবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চকরিয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়ন, বরইতলী ইউনিয়ন, লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন, কৈয়ারবিল ইউনিয়ন, কাকারা ইউনিয়ন, সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন, বমুবিলছড়ি ইউনিয়ন, চিরিংগা ইউনিয়ন, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন, ডুলাহাজারা ইউনিয়ন, খুটাখালী ইউনিয়ন, নতুন উপজেলা মাতামুহুরীর কোনাখালী ইউনিয়ন, বদরখালী ইউনিয়ন, ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন, পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়ন, পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়ন, শাহারবিল ইউনিয়ন ও বিএমচর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার বসতবাড়ির মানুষগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পাহাড়ি উজানের পানি নেমে আসায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে মাতামুহুরী নদীর পানি। এতে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উল্লেখিত ইউনিয়নের নতুন নতুন গ্রামও প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে চকরিয়ার বিভক্ত নতুন মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালীতে উপচে পড়া পানির স্রোতে ভেঙে গেছে রাবার ড্যাম সংলগ্ন বেড়িবাঁধ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যাতায়াত। লোকালয়ে হু হু করে ঢুকে পড়েছে বানের পানি। প্লাবিত হয়েছে গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম।

অপরদিকে চকরিয়া উপজেলার হারবাং বাজার স্টেশন থেকে স্থানীয় ভূমি অফিস সংশ্লিষ্ট সড়কটি ভেঙে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করেই কোনোরকম দিন পার করছে সাধারণ মানুষ। গতকাল বুধবার দুপুরে বিধ্বস্ত সড়কটি পরিদর্শন করেছেন সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের সংসদ সদস্য প্রার্থী কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর আবদুল্লাহ আল ফারুক। তিনি এসময় সড়কের ভাঙন এলাকা ঘুরে ফিরে দেখেন। তিনি উপজেলা আমীর মাওলানা আবুল বাশার ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মুঠোফোনে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অবহিত করেন।

এদিকে চকরিয়ায় একটি বসতঘরে পাহাড় ধসে রুমি (১২) ও ছেলে তাওসিফ (১৩) নামে দুই ভাই বোনের মৃত্যু হয়েছে। তারা উপজেলার বড়ইতলী ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ডের মছনিয়াকাটা গ্রামের বাসিন্দা কাজলের সন্তান। খবর পেয়ে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শাহীন দেলোয়ার ও বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান সমবেদনা জানাতে ছুটে ঘটনাস্থলে। একইভাবে ছুটে গিয়েছেন সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের এমপি প্রার্থী কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমীর আবদুল্লাহ আল ফারুক। তিনি পাহাড় ধসে নিহত দুই ভাই বোনের নামাযে জানাযায় অংশগ্রহণ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে মানবিক সহায়তা তুলে দেন।

অন্যদিকে চারদিনের ভারী বর্ষণে বৃহস্পতিবার ভোররাতে চকরিয়ার পাশ্ববর্তী এলাকা আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২), তাদের চার বছরের ছেলে মো. সোলেমান, জুয়েল (২৭) এবং তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩) প্রাণ হারায়। আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মোবারক হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থল থেকে দুই পরিবারের পাঁচ সদস্যের লাশ উদ্ধার করে।

এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে কাকারা ৪নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ সুলতানের শিশু ছেলে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চকরিয়া পৌরসভার বন্যা পরিস্থিতি খুবই নাজুক। চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যাতায়াত। বিশেষ করে পৌর এলাকার চকরিয়া থানা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, উপজেলা ভূমি অফিসসহ আদালত এলাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক দপ্তরগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সড়কটি হাঁটু পানিতে নিমজ্জিত।

এদিকে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ শাহীন দেলোয়ার জানান, বন্যা পরিস্থিতি খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যাওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া ভাঙন কবলিত এলাকাসমূহ সরেজমিনে ঘুরে দেখা হয়েছে। শীঘ্রই এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাঙামাটির ৯৮ স্থানে পাহাড় ধস

রাঙামাটি থেকে আনোয়ার আল হক: গত পাঁচদিনের টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির জনজীবন। এ পর্যন্ত জেলার অন্তত ৯৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে, পাহাড় ধসের কারণে বারেবারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রাঙামাটির সাথে সড়ক যোগাযোগ। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান, বন্ধ রাখা হয়েছে সাজেকের পর্যটন কেন্দ্র। এদিকে পাহাড় ধসের কারণে সাজেকে আটকে পড়েন ৫৭০ জন পর্যটক, এর মধ্যে ১৭০ জনকে বিজিবির সহায়তায় খাগড়াছাড়ি পার করে দেয়া হলেও অবশিষ্টরা এখনও ফেরার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে উপজেলাগুলোতে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তলিয়ে গেছে ফসল, বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি উপজেলার সাথে নৌ যোগাযোগ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার অন্তত ৯৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ২০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাপ্তাই উপজেলায় ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১১টি, নানিয়ারচরে ২টি এবং বিলাইছড়িতে ৩৭টিসহ মোট ৯৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জেলার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সড়ক মাটি ধসে পড়ে বারে বারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রাঙামাটির সঙ্গে প্রধান সড়ক যোগাযোগ। পাহাড় ধস ও সড়কে পানি উঠায় রাঙামাটির সাথে খাগড়াছড়ির যোগাযোগ বিছিন্ন রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদ ও চেঙ্গী নদীতে অতিরিক্ত ¯্রােতের কারণে বন্ধ রয়েছে কয়েকটি উপজেলার নৌপথও।

বাঘাইছড়িতে গাছ পড়ে এক পথচারী নিহত হওয়া ছাড়াও রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নে দলমনি চাকমা(৫৫) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ জুলাই নদী পারাপারের সময় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে তিনি ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের দুই দিন পর ৯ জুলাই দুপুরে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে বিলাইছড়ি উপজেলায় বুধবার থেকে একজন ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি স্রোতের তোড়ে ভেসে গেছেন।

বান্দরবান সংবাদদাতা : বান্দরবানে প্রবল বর্ষণ ও উজানের পানির স্রোতে জেলা সদরের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি পানির নীচে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিতে বান্দরবানের ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া, কালাঘাটা, ক্যাচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়াসহ বিভিন্নস্থানে নিচু এলাকায় ঘরে পানি প্রবেশ করেছে। এসব বাড়িঘরের লোকজন বিভিন্ন উঁচুভবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

পৌর প্রশাসন আশ্রিত ৩ হাজারের অধিক লোকজনকে ২দিন যাবত রান্না করা খাবার সরবরাহ করছে; জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রান্নাসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। বান্দরবানে জনস্বাস্থ্য বিভাগ শহরের বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে। মাইকযোগে পাহাড়ের ঢালে এবং ঝুকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস না করার জন্য সতর্কবাণী প্রচার করা হচ্ছে।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই, জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস, সেনাবাহিনী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা সদরে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত বৃক্ষমেলাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

জেলার আজিজ নগরে পাহাড় ধসে ৫ ব্যক্তি মারা গেছে। জেলা সদরের সাথে রাস্তার বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, রাতের দিকে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পরেনি। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। আর বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।