জুলাইয়ের দেনা পাওনা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, জুলাই আর ছাত্রশিবির একে অপরের পরিপূরক। জুলাই ইসলামী ছাত্রশিবিরকে অনেক কিছু দিয়েছে। আবার ছাত্রশিবির জুলাইয়ের জন্য সর্বেচ্চটুকু উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরাতো নিষিদ্ধ-ই ছিলাম। আমি বলতে চাই ইসলামী ছাত্রশিবিরকে তো নিষিদ্ধ করেই ফেলেছিল। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ১লা আগস্ট থেকে। সেই জায়গা থেকে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছি ক্যাম্পাসে। আমাদের কথাগুলো ছাত্রদের বলার সুযোগ পাচ্ছি। এটাতো জুলাইয়ের রক্তের বিনিময়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই সুযোগটা বাংলাদেশে দিয়েছেন। এছাড়া গণতান্ত্রিক অধিকার,মানবিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, যেগুলো থেকে আমরা বঞ্চিত ছিলাম; সাংবিধানিক অধিকার ফেরত পেয়েছে জুলাইয়ের মাধ্যমে। আর ইসলামী ছাত্রশিবির জুলাইকে কতটুকু দিয়েছে তা আজ ইতিহাস সাক্ষী। আমি বলবো সাধারণ ছাত্র-জনতার সাথে ইসলামী ছাত্রশিবির তার সর্বোচ্চটা দিয়েছে। পলিসি মেইকিং থেকে শুরু করে, মাঠের আন্দোলন সমন্বয় করা এবং সামগ্রিকভাবে জুলাইকে ধারণ করা, জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সকল ক্ষেত্রেই সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সর্বোচ্চটুকু দিয়েছে।

জুলাইয়ের মূল্যায়ন নিয়ে দেশের শীর্ষ ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, আমি বলবো সময়ের পরিবর্তনে মানুষের আবেগ অনুভূতি কমতে থাকে। তবে এটা নির্ভর করে জুলাইকে আমরা মানুষের কাছে কিভাবে উপস্থাপন করছি। জুলাইয়ের যারা সুবিধাভোগী বা নতুন বাংলাদেশের যে ডাইমেশনটার কথা আমরা বলছি, সেটা জুলাই পরবর্তীত কতটা সংস্কার হলো তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। কার্যত আমরা সরকারের কাছ থেকে এমনি কিছু প্রত্যাশা করিনি। এমনকি জুলাইয়ের পরবর্তী সময়ে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় যেভাবে উদযাপন করা হয়েছে; মানুষের সামনে উপস্থাপন করার জন্য যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসুচি যেভাবে করার সুযোগ ছিল, আমার মনে হয়না বর্তমান সরকার তার দশ ভাগের একভাগও করতে পারছে। ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা করছে না। তার মূল কারণ হচ্ছে জুলাই নিয়ে হয়তো হীনমন্যতায় ভোগে তাদের অবদানের ব্যাপারগুলোতে। অথবা তারা যে রাজনীতিটা এখন করছে, সেটা অন্য কারো কাছে মুচলেকা দিয়ে বা অন্য কারো কাছে অন্যরকম কোন আঁতাতের মধ্য দিয়ে সে রাজনীতি মেরুকরণটা করতে চাচ্ছে। এই জায়গা থেকে হয়তো জুলাইকে যেভাবে ধারণ করার কথা সেভাবে তারা করতে পারছে না। এমনকি গণভোটের রায়কে তারা বাস্তবায়ন করছেনা, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আওয়ামী আমলে যতগুলো হত্যা সংগঠিত হয়েছে, তার বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা আমরা লক্ষ্য করছি। জুলাইয়ের যে জাদুঘরটি রয়েছে এখন পর্যন্ত তারা উদ্বোধন করতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে জুলাইয়ের সবচেয়ে বেনিফিসিয়ারি বর্তমান সরকার বা বিএনপি। কিন্তু জুলাইকে ধারণ করে যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ বা সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন এটা তারা করেনি। তো সেই আগের চাঁদাবাজি বন্দোবস্ত, সিন্ডিকেট বন্দোবস্ত, দলীয়করন বন্দোবস্ত সবইতো আগের মতোই রয়েছে। মানুষ এখন স্বাভাবিক ভাবেই তুলনা করছে এতো রক্তের বিনিময়ে আমরা কি পেলাম ? সেই জায়গা থেকে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা যেভাবে ধারণ করা দরকার ছিল তা সরকার পারেনি। এর প্রভাব সমাজ এবং জনগণের মধ্যে আক্ষেপ - ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, রক্ত দিচ্ছে। কিন্Íু শেষ পর্যন্ত বৈষম্য দূর হচ্ছে না। এই জুলাই থেকে কি শিক্ষা পাওয়া যাবে ? এমন প্রশ্নে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, বাংলাদেশের কপাল খারাপ। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে দেখবেন এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা। এবং এ্ই অঞ্চলকে বিদ্রোহের নগরী বলা হয়। দীর্ঘদিন বঞ্চনার শিকার হলে তারা জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে। এবং স্বাধীনতা চায়। বার বার স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেয় সাধারণ মানুষ আর এর সুবিধাভোগ করে নির্ধারিত একটা গোষ্ঠি। এই গোষ্ঠিগুলো মানুষের রক্তের সাথে বার বার-ই প্রতারণা করেছে। এই মানুষগুলো রক্তদানের সময় বা সেক্রিফাইসের সময় পাশে থাকে না। দেখবেন মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিব ৯ মাস ছিলই না বাংলাদেশে। কি হয়েছে তা জানেও না। এটা তাজ উদ্দিন সাহেব তার বইয়ে সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন পরবর্তীতে। আর তাজ উদ্দিন বলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন তারাও ভারতে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। তাদের অবস্থান বাংলাদেশে ছিল না।

দিন মুজুর কুলি মুজুর খেটে খাওয়া মানুষ শ্রমিক এসব মানুষ মূলত মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা যুুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। ৯০’র গণ অভ্ত্থূানের অবস্থাও যদি দেখি সেটাও হাইজ্যাক হয়েছে। পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনিতো দেশেই ছিলেন না। তার নেতাকর্মীরা অকপটে স্বীকার করেছেন যে আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু তারা এখন ক্ষমতায়। সামগ্রিকভাবে তারা লাভবান হয়েছে। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগের পরিমাণটা ব্যক্তির জায়গা থেকে তুলনামূলক কম। ফলে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করা বা রক্তের পর সংস্কার গুলো করা সেগুলো কার্যকর হয়নি। এটা জাতি হিসেবে দুর্ভাগ্যই বলা যায়।

আগামী জুলাইয়ে অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাইয়ে দেশকে কেমন দেখতে চান ? এমন প্রশ্নে শিবির সভাপতি বলেন, আমরাতো আশা করি যে সংস্কারগুলো আলোচনার টেবিলে আছে জুলাই চার্টারের মধ্যে যে সংস্কারগুলো আছে সেই জিনিসগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হবে। রাষ্ট্রের যে অর্গানগুলো আছে বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে। দুর্নীতি কমিশন স্বাধীন হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে ফাংশন করবে। আমরা আরও প্রত্যাশা করি যে প্রধানমন্ত্রীর আর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে রিফরর্মেশনের কথা যেভাবে জুলাই চার্টারে বলা হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন হবে। আদালতের আদেশে সেটা ফিরে এসেছে; বিএনপি তার মতো করে যেন রিফর্মেশন না করে। আরও যে কাঠামোগত জায়গাগুলো জাতীয় অডিট নিরীক্ষা কমিটিসহ সাংবিধানিক আরও যে পদগুলো আছে, জুলাই চার্টারে বর্ণিত যে সংশোধনগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হবে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা সেটা ২০২৭ইং সালে উদযাপন করতে চাই।

জুলাইয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য শিবির কি কর্মসূচি হাতে নিবে ? এমন প্রশ্নে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম জানালেন, এই জুলাইকে কেন্দ্র করে যেমন ৩৬দিন ব্যাপী কর্মসূচি দিয়েছি; এসব কর্মসূচি কেবল ৩৬ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বছরব্যাপী জুলাইয়ের চেতনা এবং জুলাইকে ধারণ করা এবং জুলাইয়ের যে আকাক্সক্ষা ছিল তা নিয়ে আমাদের কর্মসূচিতে আমাদের আওয়াজ উঁচু করার চেষ্টা করছি। ইসলামী ছাত্রশিবির মনে করে জুলাইটা শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত কিছু উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটা একটা আন্দোলন। এই আন্দোলনের পূর্ণতা তখনই পাবে ; যখন এই আন্দোলন যে উদ্দেশ্যে সংঘঠিত হয়েছিল সেটা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। এব্যাপারে ইসলামী ছাত্রশিবির অসংখ্য কর্মসূচি পালন করছে। জুলাইয়ের চেতনাগুলোকে ধারণ করার জন্য সাংস্কৃতির জায়গা থেকে গবেষণার জায়গা থেকে কাজ করছে। বিভিন্ন ধরণের উপন্যাস নাটক নাটিকা মানুষের সামনে তুলে ধরছি। পাশাপাশি রাষ্ট্রের যে সংস্কারগুলো দরকার, সেজন্য রাস্তায় রাজপথে দাঁড়িয়ে মিছিল, মানববন্ধন করে আমাদের ভয়েজ রেইজ করার চেষ্টা করছি। এগুলো ধারাবাহিকভাবে আমরা চালিয়ে যাবো দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত।

জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করে ছাত্রশিবিরের সভাপতি বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হচ্ছে শাহাদাতবরণ করেন আমাদের শহীদ ভাইয়েরা। রাজপথে থেকে যখন তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখেছি। বিশেষ করে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে এবং আশপাশে। আন্দোলনের সময় সেখানে আমি ছিলাম। বলা যায় সেখান থেক্ইে জুলাইয়ের গণহত্যাটা শুরু হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর আঘাত করা হয়। আমার মনে পড়ে শহীদ শাকিল পারভেজের নিথর দেহ সেখানে আরও যারা শহীদ হয়েছিল। স্মৃতিগুলো খুবই কষ্টদায়ক। শহীদ শাকিল পারভেজ ছাত্রশিবিরের সাথী ছিল। তার মা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। বাবার অবস্থাও দিন আনে দিন খায়। পরিবারের দেখভাল করার জন্য তাকে টিউশন করতে হতো। তার শাহাদাতের পর লাশ দাফন কাফনের সময় দেখা গেছে সন্তান যে শহীদ হয়েছে তার মা জানতেন না। বাবা তার সন্তানের জানাযায় উপস্থিত হতে পারছে না। পুলিশের ভয়াবহ বাধা ছিল। এটা খুবই কষ্টদায়ক একটা স্মৃতি যে সন্তানকে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় দেওয়া হচ্ছে অথচ মাকে স্ইে খবরটা বলা যাচ্ছে না। বাবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মায়ের কাছে গিয়ে। মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুর খবরটা বলতে এক দুই সপ্তাহ লেগেছে। এটা মাত্র একটা কষ্টদায়ক স্মৃতি। এরকম অসংখ্য স্মৃতি আছে।