॥ ডা. মু. শফিকুল ইসলাম ॥
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভূখ-, সম্পদ বা সামরিক সক্ষমতা নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতন জনগণ। যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে, বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সজাগ থাকে, সেই জাতিকে বিভ্রান্ত করা কঠিন, পরাজিত করা আরও কঠিন।
বাংলাদেশের জন্ম কোনো দয়া বা অনুগ্রহের মাধ্যমে নয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র জাতির সম্মিলিত কর্তব্য।
বর্তমান বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের কৌশল আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। সরাসরি আগ্রাসনের পরিবর্তে নানা ধরনের নরম কৌশল, তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সাংস্কৃতিক প্রভাব কিংবা বিভিন্ন আবেগঘন ইস্যুর মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা দেখা যায়। কখনো ধর্মের নামে, কখনো মানবতার নামে, কখনো সম্প্রীতির কথা বলে, আবার কখনো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী পক্ষ নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে। তাই কোনো বিষয়কে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি।
এ কথা সত্য যে বাংলাদেশ বহু ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতের মানুষের দেশ। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সম্প্রীতির অর্থ কখনোই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়। সহাবস্থানের অর্থও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে সেই স্বাধীনতা যেন রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়-সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
সচেতনতা মানে অন্ধ সমর্থন নয়, আবার অকারণ সন্দেহও নয়। সচেতনতা মানে তথ্য যাচাই করা, সত্য-মিথ্যা পৃথক করার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজন হলে যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন তোলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নাগরিকদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করা এখন নাগরিক সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যে জাতি নিজের স্বার্থ সম্পর্কে সজাগ থাকে এবং সংকটের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, তাকে পরাজিত করা যায় না। স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়; এটি একটি চলমান দায়িত্ব। প্রতিটি প্রজন্মকে সেই দায়িত্ব নতুন করে বহন করতে হয়। জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস না করার মানসিকতাই একটি জাতিকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, মর্যাদাবান ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণই। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বহিরাগত শক্তি নয়-এই দেশের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার একমাত্র এ দেশের মানুষের। তাই সময়ের দাবি একটাই-সচেতন থাকি, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিই এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি। কারণ সচেতন জনগণই একটি রাষ্ট্রের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা এবং একটি জাতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যৎ।