ম্যাচে দারুণ খেলেছেন মেসি
কামরুজ্জামান হিরু
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মহাতারকা লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন উপহার দিয়েছে। বুধবার রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এক রুদ্ধশ্বাস সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আলবিসেলেস্তেরা। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের জাদুতে সমতা ফিরিয়ে এবং যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক গোলে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নেয় স্কালোনির দল। এই জয়ের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে আর্জেন্টিনাÑ বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিতের পাশাপাশি তারা আবারও ফিরে পেয়েছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান।
রোববারের ফাইনালে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। ইতালি (১৯৩৪, ১৯৩৮) এবং ব্রাজিলের (১৯৫৮, ১৯৬২) পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতার বিরল কীর্তির হাতছানি এখন মেসিদের সামনে।
বিশ্বকাপের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচটি শুরু থেকেই রূপ নেয় চরম উত্তেজনায়। ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ফাউল করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরুতেই মাঠে বাগবিত-ায় জড়ায় দুই দলের খেলোয়াড়রা। প্রথমার্ধে ফুটবলের চেয়ে শারীরিক শক্তির প্রদর্শনই যেন বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাথকে হিমশিম খেতে হয়। প্রথমার্ধেই দুই দল মিলিয়ে ফাউল করে ১৯টি, যার মধ্যে ১২টিই আর্জেন্টিনার। গোলপোস্টে কোনো দলই একটি শটও রাখতে পারেনি, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলহীন প্রথমার্ধের সবচেয়ে বিব্রতকর রেকর্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মরগান রজার্সের ক্রসে দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেন অ্যান্থনি গর্ডন। পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনার ওপর চাপ আরও বাড়ে। ওদিকে ইংলিশ ডিফেন্ডার জেড স্পেনসের অবিশ্বাস্য সব ট্যাকলে বারবার খেই হারাচ্ছিল আলবিসেলেস্তেরা। এরপরই ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিয়ে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে মাঠে নামান। আর এই রক্ষণাত্মক মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি মাঝমাঠে বোতলবন্দী হয়ে থাকা ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসিকে সরিয়ে নিয়ে যান ডান প্রান্তে। স্কালোনির এই একটি চালই তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয় ইংলিশ ডিফেন্সকে। ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়ে মেসি বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার। ৫৫ থেকে ৯২ মিনিটের মধ্যে ৮৮ শতাংশ বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার কাছে। এমনকি ৬৬ থেকে ৮৪ মিনিটের মধ্যে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা মাত্র ২টি সঠিক পাস দিতে পেরেছিলেন, যা ছিল গোলরক্ষক পিকফোর্ড ও ডিফেন্ডার স্টোনসের পারস্পরিক পাসিং! ইংল্যান্ডকে পুরোপুরি বোকা বানিয়ে ৮৫ মিনিটে মেসির পাস থেকে বক্সের বাইরে থেকে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া বুলেট গতির শটে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিট) মেসির মাপা ক্রস থেকে দারুণ হেডে লক্ষ্যভেদ করে আর্জেন্টিনাকে উল্লাসে মাতান লাউতারো মার্তিনেজ।
ম্যাচে মেসির একার ড্রিবলিং ছিল ৯টি, যেখানে পুরো ইংল্যান্ড দল মিলে করেছে ৭টি! ম্যাচে গোল না পেলেও দুটি অ্যাসিস্ট করে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে টপকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার উপরে উঠে এসেছেন মেসি। বর্তমানে মেসি ও এমবাপ্পে দুজনেরই গোলসংখ্যা ৮টি। তবে ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে নিয়মানুযায়ী এমবাপ্পের (৩ অ্যাসিস্ট) চেয়ে এগিয়ে আছেন মেসি।
ম্যাচ শেষে নিজের হতাশা লুকাতে পারেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন। মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘ সময় ওকে ভালোভাবেই আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যা হয়, বল পেলেই তারা নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এমনি এমনি তো তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হননি।” অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের এমন রক্ষণাত্মক ভুলের দায় নিজের কাঁধেই নিয়েছেন ইংলিশ কোচ থমাস টুখেল। ম্যাচ শেষে ফুটবলারদের সান্ত¡না দিলেও হ্যারি কেইন জানান, “টুখেল আসলে আমাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমরা আর্জেন্টিনার আক্রমণের তীব্রতায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।”
বিপরীতে, কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনার কৃতিত্ব খেলোয়াড়দের দিয়েছেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। শিষ্যদের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,“ফুটবলে এবং জীবনে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবকিছু উজাড় করে দিতে হয়। এই দলটির সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তারা যখন বিপদে পড়ে তখন আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। আমরা যদি আজ হেরেও যেতাম, তাও আমি ছেলেদের নিয়ে গর্ব করতাম কারণ তারা শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই থামায়নি।” স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল নিয়ে স্কালোনি যোগ করেন, “ফাইনালে আমরা আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করব। এই জার্সিটির একটি আলাদা গৌরব রয়েছে, যার মর্যাদা ধরে রাখতে আমরা মাঠে সব ঢেলে দেব।”
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তাপও ছুঁয়ে গেছে ম্যাচটিকে। ম্যাচ শেষে উদযাপনের সময় গ্যালারি থেকে ছিটকে আসা একটি ব্যানার হাতে তুলে নেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। যাতে লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আরহেনতিনাস’ (মালভিনাস/ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার)। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধপূর্ণ এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব দাবি করে ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় ফিফাকে তদন্তের আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। তবে রাজনৈতিক টেবিলে বিতর্ক যা-ই থাকুক, ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করলÑ কেন তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে ওঠার উদযাপনের মাঝেই আলবিসেলেস্তেদের চোখ এখন লা রোহাদের হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার দিকে।