• আন্দোলনকারীদের আটকে দিচ্ছে পুলিশ
  • মোদি-রাহুলের তীব্র বাকযুদ্ধ
  • শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আজ শুক্রবার দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে সিজেপি এই তথ্য জানিয়েছে। এনডিটিভি, এএনআই, দ্য হিন্দু

একই সঙ্গে দলটি আবারও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি জানিয়েছে। এদিন সিজেপি ভারতের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে নাগরিকদের বিক্ষোভে অংশ নেয়ার আহ্বান করে।

দলটির লক্ষ্য, চলমান আন্দোলনকে একটি সর্বভারতীয় গণআন্দোলনে রূপ দেয়া।

এদিকে এরইমধ্যে নিটের প্রশ্নফাঁস ইস্যুর সঙ্গে জড়িতদের ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তরুণদের মঙ্গল ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত।’ তবে মোদির এই অঙ্গীকারের পরেও কোনোভাবেই থামছে না তেলাপোকাদের আন্দোলন।

রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে সিজেপির বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ছাত্র-যুবদের যোগদান বেড়ে চলছিল। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শিক্ষার্থীদের জমায়েতে অংশ নিচ্ছেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার সতর্কতা হিসেবে প্রচুর পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী নিয়োগ করেছে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে বুধবার রাতে উত্তপ্ত হয়েছিল দিল্লির যন্তরমন্তর চত্বর।

বৃহস্পতিবার সকালে সেখানকার পরিস্থিতি খানিক থমথমে। তবে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে মানুষের। ‘নিরাপত্তাগত কারণে’ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন।

মুম্বাইয়ে গেলে মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি পুলিশের

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে রাজ্যের মুম্বাইয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁদের মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মুম্বাই কংগ্রেসের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন মোকাবিলায় মুম্বাই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

গত কয়েক দিনে শিবাজি পার্ক, চেম্বুর, আজাদ ময়দানসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে।

মুম্বাই কংগ্রেসের পোস্ট করা ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক পুলিশ কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের একটি দলকে হুমকি দিচ্ছেন, তাঁরা যদি আবারও আন্দোলনে আসেন, তবে তাঁদের মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে।

ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মুম্বাই পুলিশ ভিডিওটির সত্যতা যাচাই এবং এর পেছনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।

তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত ইউনিফর্ম পরা পুলিশের ওই গাড়িচালককে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভিডিওতে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তোদের ব্যাগে ৫০-৫০ গ্রাম পাউডার (মাদক) ঢুকিয়ে দেব। তোদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।’

এরপর ওই পুলিশ সদস্য আন্দোলনকারীদের বলেন, তাঁদের এই আন্দোলনের কারণে তাঁর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

ভিডিওটি পোস্ট করে কংগ্রেসের মুম্বাই শাখা জানিয়েছে, ‘একটি ভাইরাল ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, মুম্বাই পুলিশ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়ে বলছে, তারা যদি আবারও বিক্ষোভ করতে ফিরে আসে, তবে তাদের মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানো হবে এবং সারাজীবন কারাগারে পচে মরতে বাধ্য করা হবে।’

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় রাজি মোদি সরকার

ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, পাটনা, কলকাতার মতো শহরগুলোতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাই সুর নরম করেছে নরেন্দ্র মোদির কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। তারা এখন আন্দোলনকারীদের ‘সুবিধাজনক যেকোনও সময়ে’ আলোচনায় রাজি।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং বলেছেন, বুধবার থেকেই আলোচনার জন্য চারটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে সরকার। তবে আন্দোলনরত গোষ্ঠীগুলো আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার বাসভবন বা কার্যালয়ে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ‘যন্তর মন্তর’ কিংবা অন্য কোনও নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছে।

জিতেন্দ্র সিং বলেন, “বুধবার দুপুর থেকে সরকার তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য চারটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সরকার আপনাদের সুবিধামতো যেকোনও সময় সব বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।”

মন্ত্রী জানান, আলোচনার সময় তার সঙ্গে সহকর্মী মন্ত্রী জেপি নাড্ডাও উপস্থিত থাকবেন।

সিং আরও যোগ করেন, “আলোচনা জেপি নাড্ডার কার্যালয় বা বাসভবনে হতে পারে। আমরা অহমিকা বা মর্যাদার লড়াইয়ে বিশ্বাসী নই। আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং আমি উভয়েই উপস্থিত থাকব। ধীরে ধীরে আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি সমাধানের দিকে এগিয়ে যাব। এটি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষপেরই একটি অংশ। আমি আপনাদের সকলকে বিনীতভাবে আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন এবং আলোচনায় বসুন।”

এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়ি বা অফিসে নয়, বরং যন্তর মন্তরে কিংবা কোনও নিরপেক্ষ স্থানে বৈঠকে বসবে তারা।

যন্তর মন্তর অভিমুখীদের আটকে দিচ্ছে পুলিশ

ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত প্রতিবাদ বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীদের পথরোধ করেছে দিল্লি পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে অটো রিকশায় রওনা দেওয়া একদল শিক্ষার্থীকে কর্মসূচিস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের সামনে এগোতে বাধা দেওয়া হয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানান, কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না করেই তারা স্বাভাবিকভাবে অটো রিকশায় চড়ে বিক্ষোভস্থলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝপথেই তাদের আটকে দেয়।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যুক্তি দিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট এলাকা জুড়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) সংস্থান অনুযায়ী ১৪৪ ধারা জারি থাকায় বিশৃঙ্খলা এড়াতেই বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের পথরোধ করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার অনিয়মের বিরুদ্ধে সিজেপি এবং একাধিক ছাত্র সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে দিল্লিতে এই কর্মসূচি গড়ে উঠেছে। তবে বিক্ষোভস্থলে গণজমায়েত ঠেকানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন পয়েন্টে কড়া নিরাপত্তার বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মোদি-রাহুলের তীব্র বাকযুদ্ধ

ভারতে চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে।

দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে দুই শীর্ষ নেতার বিপরীত অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সরকারের অবস্থান স্পষ্ট উল্লেখ করে মোদি বলেন, যুবসমাজের স্বপ্ন পূরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই পালটা প্রতিক্রিয়া জানান কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের তরুণদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই।

তার দাবি, বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে রক্ষা করেছে।

রাহুল গান্ধী তার বার্তায় বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি দখল ও ধ্বংস করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে উৎসাহও দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এই অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, এ কারণেই আজ দেশের লাখো শিক্ষার্থী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত করলেই হবে না, পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হচ্ছে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থায় একের পর এক অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।

তাদের মতে, পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তরুণ সমাজের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা বলছেন, সরকার কোনো ধরনের অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তরুণদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।