রবিউল ইসলাম
একটি দেশের বাজেট কেবল সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের গাণিতিক খতিয়ান নয়; বরং তা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন. সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক জীবন্ত রূপরেখা। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৭ (১) অনুচ্ছেদে যাকে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, তা আসলে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানদণ্ড নির্ধারণকারী এক অমোঘ দলিল।২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ঘোষিত হয়েছে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি একযোগে বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝড়ের মুখোমুখি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত ক্ষয় এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার এই রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট কি বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে, নাকি এটি কেবলই এক কাগুজে উচ্চাভিলাষের নতুন সংস্করণ?
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো এর আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত। দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের বড় অংশই আমদানিকৃত তেল ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সামান্যতম ওঠানামা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানে। পরিবহন খরচ ও শিল্পোৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির এই শৃঙ্খল শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে এসে পড়ে। আইএমএফের ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে সরকার যখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায়, তখন তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তির টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কার্যত অসম্ভব। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা আর বালির বাঁধে পানি আটকানো একই কথা ।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও বাজেটটিতে এক বিশাল বৈষম্য ও অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা পরিলক্ষিত হয়। এবারের বাজেটে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড মাত্র ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই যেখানে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছুঁয়েছে, সেখানে এই নতুন লক্ষ্যমাত্রাকে অর্থনীতিবিদরা ‘আকাশকুসুম’ বলে মনে করছেন। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন (মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ)। একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি করজালের সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে; অন্যদিকে আন্ডার-ইনভয়েসিং ও হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে।
কর প্রশাসনের আমূল ডিজিটাল রূপান্তর না করে, কালো টাকা সাদা করার অসাধু সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে শুধু মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শে্িরণর ওপর করের বোঝা চাপালে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। আয়ের ঘরে এই বিশাল শূন্যতা থাকলে ব্যয়ের পরিকল্পনাগুলো কাগজে বাণীরূপেই থেকে যাবে।
কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার কথা বাজেটে তাত্ত্বিকভাবে চমৎকারভাবে বলা হলেও, ভর্তুকির ভেতরের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট ভর্তুকি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হলেও এর সিংহভাগই গিলে খাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। বিপরীতে, কৃষি ভর্তুকির বৃদ্ধির হার মাত্র ৬ থেকে ৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। সার, বীজ, ফিড ও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের আকাশচুম্বী দামের কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে তারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাচ্ছেন না। ভর্তুকি কাঠামোর এই কৃষিকেন্দ্রীকতা থেকে সরে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে, বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ঘাটতি ধরা হয়েছে, তা পূরণে সরকার যদি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তবে তা বেসরকারি খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। একে অর্থনীতিতে বলা হয় ‘ক্রাউডিং প্রভাব যেখানে ব্যাংকগুলো সরকারকে নিরাপদ ঋণ দিতে গিয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া বন্ধ বা সীমিত করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক প্রভাব, বেনামি ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণের পাহাড়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের মেরুদণ্ড এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। সুদের উচ্চ হার ও ডলার-সংকটে বেসরকারি বিনিয়োগ এমনিতেই স্থবির, এর ওপর ঋণের প্রাপ্যতা আরও সঙ্কুচিত হলে শিল্পায়ন থমকে যাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সমস্ত পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়বে।
এই অর্থনৈতিক সংকটের প্রথম ধাক্কাটি এসে পড়ে দেশের শ্রমজীবী ও নারী সামর্থ্যের ওপর। গত দুই দশকে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে। নারী বেকারত্বের উচ্চ হার এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের কর্মসংস্থানের বাইরে থাকার হার উদ্বেগজনক হওয়া সত্ত্বেও বাজেটে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ডিজিটাল সেবায় প্রবেশাধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য বিশেষ থোক বরাদ্দ অপ্রতুল। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল সংখ্যার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্ন। পাশাপাশি, আমাদের নদী ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো সাহসী পদক্ষেপ বাজেটে অনুপস্থিত। দেশের মৃতপ্রায় নদীপথগুলো যদি খনন ও সচল করা যেত, তবে পণ্য পরিবহন খরচ এক- তৃতীয়াংশে নেমে আসত, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখত।
নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা নীতিগতভাবে প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন কঠোর সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা আর তা গুণগতভাবে বাস্তবায়ন করার মধ্যে বাংলাদেশে সবসময়ই একটি বড় ফারাক থাকে।
প্রবৃদ্ধি বা জিলেপি সংখ্যার চাকচিক্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হাহাকার ঢাকা যায় না। দেশের মানুষ এখন চায় নিত্যপণ্যের বাজারের স্বস্তি, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আসল সাফল্য তাই কোনো তাত্ত্বিক মডেলে নয়, বরং সাধারণ মানুষের পকেটে ও প্লেটে কতটুকু স্বস্তি ফিরল তা দিয়েই নিরূপিত হবে।
লেখক : কলামিষ্ট, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।